কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক :

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ নিয়ে বিবাদ যেন শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। দলের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কার হাতে, ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনী প্রতীকের অধিকার কোন শিবির পাবে—এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে আজ ফের নির্বাচন কমিশনের মুখোমুখি হতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, ঋতব্রত শিবিরের প্রতিনিধিদের বিকেল তিনটেয় এবং কালীঘাট শিবিরকে বিকেল চারটেয় দিল্লির নির্বাচন সদনে হাজির হতে বলা হয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই সর্বাধিক পাঁচজন করে প্রতিনিধি শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। ঋতব্রত শিবিরের তরফে আইনজীবীর পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, অরূপ রায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং আখরুজ্জামান দিল্লিতে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে কালীঘাট শিবিরের হয়ে আইনজীবী ও সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও তাঁর সঙ্গে আর কারা থাকবেন, তা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্পষ্টতা ছিল না।

প্রতীক ও দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই শিবিরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের কাছে চূড়ান্ত নথি এবং লিখিত বক্তব্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। বুধবার বিকেল তিনটের মধ্যে দুই পক্ষই নিজেদের শেষ দফার নথি জমা দিয়েছে বলে সূত্রের খবর। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তী সময়ে দুই শিবিরকে সরাসরি ডেকে বক্তব্য শোনা হবে। সেই সূত্রেই বৃহস্পতিবারের শুনানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, কমিশনে জমা দেওয়ার মতো সমস্ত জবাব তাঁরা পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের উপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এমনকি জমা দেওয়া জবাবের একটি কপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। অন্যদিকে কালীঘাট শিবিরের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এবং আদালতের বিবেচনাধীন বলে মন্তব্য করতে চাননি। তাঁর বক্তব্য, প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়টি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখছেন। আসন্ন উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত প্রার্থীরাই মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি বলেও দাবি করেছে কালীঘাট শিবির।

তবে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু দলের নাম বা প্রতীক নয়, আসন্ন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনও। দুই শিবিরই ইতিমধ্যে ওই দুই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছে এবং উভয় পক্ষের প্রার্থীরাই জোড়াফুল প্রতীক দাবি করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে মনোনয়নপত্রের স্ক্রুটিনি হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের শেষ দিন। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলির রিটার্নিং অফিসারদেরও প্রতীক সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। প্রাক্তন নির্বাচন আধিকারিকদের একাংশের মতে, স্ক্রুটিনি এবং প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যে কমিশনকে অন্তত একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে হতে পারে। কারণ একই প্রতীক দাবি করে দুই পক্ষের প্রার্থীরা নির্বাচনী ময়দানে থাকলে ব্যালট পেপার বা ইভিএমে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে প্রশাসনিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

কমিশন যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে প্রার্থী প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সেই কারণেই বৃহস্পতিবারের শুনানিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যদিও কমিশন শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের নির্দেশ দেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কমিশন কোনও এক পক্ষকে প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে, অথবা দুই পক্ষের দাবির উপর আরও নথি ও ব্যাখ্যা চাইতে পারে—সব সম্ভাবনাই খোলা রয়েছে।

প্রতীক হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলেই ঋতব্রত শিবির মনে করছে। অন্যদিকে কালীঘাট শিবিরের বক্তব্য, প্রতীক কোনও দলের একমাত্র পরিচয় নয়; নেতৃত্ব এবং মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কই আসল। কুণাল ঘোষের বক্তব্যে সেই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর দাবি, ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বকে বিভিন্ন সময়ে প্রতীক পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাঁর মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দলের মূল ভরকেন্দ্র এবং তিনি যে প্রতীকে প্রার্থী দাঁড় করাবেন, সেই প্রতীকেই কর্মী-সমর্থকেরা লড়াই করবেন। প্রতীকের চেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রহণযোগ্যতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে কালীঘাট শিবিরের রেজিনগর প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর বক্তব্য, প্রতীক সংক্রান্ত জটিলতা না কাটলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচারে আসবেন না বলে জানিয়েছেন। যদিও কালীঘাট শিবিরের পক্ষ থেকে পাল্টা বলা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণত উপনির্বাচনের প্রচারে সরাসরি অংশ নেন না। ফলে ওই বক্তব্যকে ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।

প্রতীক বিতর্কের পাশাপাশি বিদ্রোহী বিধায়কদের বিধায়ক পদ খারিজের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। কালীঘাট শিবিরের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বিদ্রোহী ১০ বিধায়কের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার আবেদন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে বিধানসভা সচিবালয় চিঠি পাঠিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

এই চিঠিকে অবশ্য খুব বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট আবেদন বা এসএলপিতে একাধিক ত্রুটি রয়েছে এবং নথির কিছু অংশও অনুপস্থিত। সেই কারণে বিধানসভা সচিবালয়ের চিঠির আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রতীক বিতর্কের পাশাপাশি বিধায়ক পদ খারিজের প্রক্রিয়াতেও তাঁরা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।

কালীঘাট শিবির অবশ্য পাল্টা জানিয়েছে, আবেদনে কোনও ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে নেওয়া হবে। অর্থাৎ দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখন নির্বাচন কমিশনের শুনানির গণ্ডি ছাড়িয়ে আদালত, বিধানসভা এবং সাংগঠনিক কর্তৃত্বের প্রশ্নেও বিস্তৃত হয়েছে।

এই প্রতীক-বিতর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট গভীর। একটি দলের নির্বাচনী প্রতীক শুধু ভোটের সময় চেনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়, কর্মী-সমর্থকদের আবেগ এবং সাংগঠনিক উত্তরাধিকারের প্রতীক। ফলে জোড়াফুল প্রতীক কোন শিবিরের হাতে থাকবে, তার উপর দুই পক্ষের রাজনৈতিক দাবি ও ভবিষ্যৎ সংগঠন গড়ে তোলার কৌশল অনেকটাই নির্ভর করবে।

অন্যদিকে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বহুমুখী লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের দুই শিবিরের পাশাপাশি বিজেপি, কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলিও নির্বাচনী ময়দানে রয়েছে। ফলে প্রতীক নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে তা ভোটারদের মধ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত।

তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কোন নথিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, সাংগঠনিক সমর্থন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অবস্থান কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বৃহস্পতিবারের শুনানির পর কমিশন তাৎক্ষণিক কোনও নির্দেশ দেয় কি না, নাকি সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে যায়, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।

জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে এই লড়াই আপাতত শুধু দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পরিচয়, নেতৃত্বের বৈধতা এবং আসন্ন উপনির্বাচনে ভোটের ময়দানে দুই পক্ষের অবস্থান। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই সেই বিতর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের দিক নির্ধারণ করবে।

 

Who Will Get the TMC Twin Flower Symbol? Mamata and Ritabrata Factions Face Election Commission Again

 

The dispute over the Trinamool Congress party name and its traditional twin flower symbol has reached another crucial stage. The Election Commission has called representatives of both the Mamata Banerjee-led Kalighat faction and the Ritabrata Banerjee-led rebel faction for a fresh hearing.

Both groups have submitted their final documents and claimed the twin flower symbol while fielding candidates for the Nandigram and Rejinagar bypolls. With the nomination scrutiny and withdrawal deadlines approaching the Election Commission decision has become extremely important.

The hearing may determine the next course of the TMC symbol dispute and could have a direct impact on the upcoming West Bengal bypolls.