কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক:

টানা ভারী বৃষ্টির জেরে নিউ ফরাক্কা জংশনের কাছে রেললাইনের নীচের মাটি বসে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ। বুধবার রাত থেকেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হলেও বৃহস্পতিবার থেকে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন বাতিল ও নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। শুক্রবারও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে এই বিপর্যয়ের জেরে হাজার হাজার যাত্রী চরম সমস্যায় পড়েছেন।

রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, নিউ ফরাক্কা জংশনে ঢোকার মুখে কেবিন সংলগ্ন এলাকায় আপ লাইনের নীচের মাটি আচমকা বসে যায়। প্রবল বৃষ্টির জেরে মাটির নীচে জল ঢুকে জমি দুর্বল হয়ে যাওয়াকেই প্রাথমিক ভাবে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার অংশে রেললাইনের নীচের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার খবর পাওয়ার পরই রেলের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মেরামতির কাজ শুরু করেন।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় বৃহস্পতিবার রাতে। মেরামতির কাজ চলার মধ্যেই নিউ ফরাক্কার কাছে ফের নতুন করে মাটি বসে যায়। এর ফলে মেরামতির কাজে সাময়িক বাধা তৈরি হয় এবং একটি ওভারহেড বৈদ্যুতিক খুঁটিও হেলে পড়ে বলে রিপোর্টে জানা গিয়েছে। রাত প্রায় ১টা ২০ মিনিট থেকে তিলডাঙা-নিউ ফরাক্কা সেকশনের আপ লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। ডাউন লাইনে সীমিত ভাবে ট্রেন চালানোর চেষ্টা করা হলেও যাত্রী নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়।

পূর্ব রেলের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় দেড়শো কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারকে কাজে নামানো হয়েছে। ঝাড়খণ্ড থেকে পাথরের চিপস ও ব্যালাস্ট এনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের নীচের মাটি পুনর্গঠনের কাজ চলছে। রেলের জেনারেল ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে মেরামতির কাজ দিন-রাত চালানো হচ্ছে। তবে নতুন করে ধস নামার কারণে সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পূর্ব রেলের জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানিয়েছেন, শুক্রবার উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। শনিবারের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুক্রবার একাধিক ট্রেন বাতিল রাখার অন্যতম কারণ ছিল মেরামতির কাজে রেলের গোটা বাহিনীকে কাজে লাগানো। তবে প্রকৃতির প্রতিকূলতা কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

এই পরিস্থিতিতে বাতিল হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন। হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি শতাব্দী এক্সপ্রেস, কলকাতা-বালুরঘাট তেভাগা এক্সপ্রেস, হাওড়া-মালদহ টাউন ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-নিউ আলিপুরদুয়ার তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-আলিপুরদুয়ার কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-সহরসা হাটেবাজারে এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-মালদহ টাউন গৌড় এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-নিউ আলিপুরদুয়ার দার্জিলিং মেল, শিয়ালদহ-বালুরঘাট এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-নিউ আলিপুরদুয়ার পদাতিক এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ-জলপাইগুড়ি রোড হামসফর এক্সপ্রেস, কলকাতা-রাধিকাপুর এক্সপ্রেস এবং হাওড়া-কামাখ্যা বন্দে ভারত-সহ একাধিক পরিষেবা এই বিপর্যয়ের প্রভাবে পড়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে ট্রেনের তালিকায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে এবং কিছু ট্রেন বাতিলের পাশাপাশি ঘুরপথে চালানো বা যাত্রাপথ সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

শুধু দূরপাল্লার ট্রেন নয়, স্থানীয় এবং আন্তঃজেলা পরিষেবাতেও এর প্রভাব পড়েছে। মালদহ, নিউ ফরাক্কা, আজিমগঞ্জ ও সংলগ্ন রুটের একাধিক ট্রেন বাতিল বা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের সমস্যাও বেড়েছে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিউ ফরাক্কা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডর হওয়ায় এই একটি জায়গায় পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে গোটা রেল নেটওয়ার্কে।

ট্রেন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের সামনে তৈরি হয়েছে বিকল্প যাতায়াতের সমস্যা। অনেক যাত্রী বাসের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে বেসরকারি বাস পরিষেবায় চাপ বেড়েছে এবং কোথাও কোথাও ভাড়া বাড়ার অভিযোগও উঠেছে। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ যাওয়ার জন্য বিমান পরিষেবার উপরেও চাপ বেড়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানা গিয়েছে। বিকল্প পরিবহণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে রেলের কাছে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যাত্রীদের জন্য কোনও বিকল্প পরিবহণের ব্যবস্থা করা হবে কি না। পূর্ব রেলের বক্তব্য, বিপর্যয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হওয়ায় প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ দ্রুত নিরাপদ করে তোলার কাজে। আপাতত পৃথক কোনও বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। ফলে যাত্রীদের নিজেদের মতো করে বাস, গাড়ি বা বিমান পরিষেবার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বিপর্যয়ের কারণে শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই বাড়েনি, উত্তরবঙ্গের পর্যটন এবং ব্যবসার উপরও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম, ডুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বহু মানুষ ট্রেনের উপর নির্ভর করেন। দীর্ঘ দূরত্বের ট্রেন বাতিল হওয়ায় পর্যটক, ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী এবং জরুরি কাজে যাতায়াতকারী মানুষদের পরিকল্পনা বদলাতে হচ্ছে।

রেল কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন মেরামতির কাজ দ্রুত শেষ করা হলেও তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস না করা। কারণ রেললাইন মেরামতির পরেও যদি মাটির নীচের অংশ পুরোপুরি স্থিতিশীল না হয়, তাহলে দ্রুত ট্রেন চালানো নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবল বৃষ্টির পরে রেললাইনের নীচের মাটি ও পার্শ্ববর্তী জমির স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করে তবেই পূর্ণ গতিতে ট্রেন চালানো উচিত।

রেলের তরফে শনিবারের মধ্যে পরিষেবা স্বাভাবিক করার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু নতুন করে ধস বা ভারী বৃষ্টি হলে সেই সময়সীমা বদলে যেতে পারে। তাই যাত্রীদের উদ্দেশে রেলও পরামর্শ দিয়েছে, যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট ট্রেনের সর্বশেষ পরিষেবা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নিতে।

নিউ ফরাক্কার এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর কতটা সংবেদনশীল। একটি জায়গায় মাটি বসে যাওয়া কিংবা ধস নামলেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের যাত্রীদের উপরেও। তাই দ্রুত মেরামতির পাশাপাশি বর্ষার মরশুমে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলির নিয়মিত ভূ-প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং আগাম নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

এখন নজর নিউ ফরাক্কার দিকে। রেলের শতাধিক কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত। লক্ষ্য একটাই—যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে ট্রেন চলাচল ফিরিয়ে আনা। তবে উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের কাছে আপাতত একটাই প্রশ্ন, শনিবার সত্যিই কি ফিরবে ট্রেনের স্বাভাবিক ছন্দ, নাকি পাহাড় ও সমতলের সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে?