ঐতিহ্যের ইঞ্জিন শেডে দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন; ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামতি শুরু, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দার্জিলিংয়ে রেলকর্তারা !

কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক:

পাহাড়ে টানা বৃষ্টি। তার মধ্যেই দার্জিলিং স্টেশনে হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনের লোকো শেডের একাংশ। বুধবার সকালের এই ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত সাত জন রেলকর্মী, তাঁদের মধ্যে এক জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী বলেও রেল সূত্রে জানা গিয়েছে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁদের আঘাত গুরুতর নয় বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনার পর দার্জিলিংয়ের জনপ্রিয় ১৬ কিলোমিটার ‘জয় রাইড’ পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে। বুধবারের নির্ধারিত চারটি জয় রাইডই বাতিল করা হয়েছে বলে একাধিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি আবহাওয়ায় গত কয়েক দিন ধরেই চলছে প্রবল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির জেরে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে ধস এবং পরিকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা। এর মধ্যেই দার্জিলিং স্টেশনের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত টয় ট্রেনের ইঞ্জিন শেডের একাংশ ভেঙে পড়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সকালে প্রায় ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে। সেই সময় শেডের ভিতরে কর্মীরা কাজ করছিলেন। আচমকা ছাদের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ায় কয়েক জন কর্মী তার নীচে আটকে পড়েন এবং আহত হন। অন্য রেলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। পরে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার খবর পেয়েই দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। ক্ষতিগ্রস্ত শেডের এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। কী কারণে শেডের ছাদ আচমকা ভেঙে পড়ল, তার তদন্তও শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে টানা বৃষ্টির প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হলেও শেডের কাঠামোগত অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নির্মাণগত নিরাপত্তার বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের অধিকর্তা ঋষভ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাত থেকেই প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। সকালে লোকো শেডের একাংশ ভেঙে পড়ে। রেলকর্মী এবং স্থানীয়েরা দ্রুত উদ্ধারকাজে হাত লাগান। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এই দুর্ঘটনার পর টয় ট্রেনের পরিষেবা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে এখানে দূরপাল্লার NJP–Darjeeling–NJP টয় ট্রেন পরিষেবা এবং দার্জিলিংয়ের জনপ্রিয় Joy Ride-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর দার্জিলিংয়ের ১৬ কিলোমিটার Joy Ride পরিষেবা স্থগিত করা হয়েছে এবং বুধবারের নির্ধারিত চারটি পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে আপনার দেওয়া রেল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী NJP–Darjeeling–NJP রুটের পরিষেবা চালু রাখা হয়েছিল।

দুর্ঘটনার পরে লোকোমোটিভের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও বিভিন্ন রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেডের অংশ ভেঙে পড়ায় ভিতরে থাকা চারটি টয় ট্রেনের লোকোমোটিভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রেল কর্তৃপক্ষ সেগুলির অবস্থা পরীক্ষা করছে। অন্যদিকে প্রাথমিক রেল-সূত্রের প্রতিবেদনে ইঞ্জিনগুলি অক্ষত থাকার কথা জানানো হয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনও রেলের পরিদর্শন ও মূল্যায়নের উপর নির্ভর করছে।

রেল কর্তৃপক্ষের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত লোকো শেডের অংশ মেরামতির কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে শেডের কাঠামো কতটা নিরাপদ, ভবিষ্যতে সেখানে কর্মীদের কাজ করা কতটা নিরাপদ এবং পরিষেবা ফের চালু করার আগে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। Katihar Division-এর Divisional Railway Manager এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা পরিস্থিতি পরিদর্শনের জন্য দার্জিলিংয়ের দিকে রওনা হয়েছেন বলে রেল সূত্রে জানা গিয়েছে।

এই দুর্ঘটনা নিয়ে রেলকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নিরাপদ পরিবেশে কাজের নিশ্চয়তা, দ্রুত শেড সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। কর্মীদের বক্তব্য, লোকো শেডটি শুধু ইঞ্জিন রাখার জায়গা নয়, ঐতিহাসিক দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের ইঞ্জিনগুলির রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাঠামো পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাজের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু একটি রেলপথ নয়, পাহাড়ি ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৮৭৯ থেকে ১৮৮১ সালের মধ্যে নির্মিত এই সরু গেজ রেলপথ নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পাহাড়ের উচ্চতায় উঠে যায়। ১৯৯৯ সালে UNESCO দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েকে World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এই ঐতিহাসিক রেলপথের সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণগুলির একটি দার্জিলিংয়ের Joy Ride। দার্জিলিং থেকে ঘুম, বাতাসিয়া লুপ হয়ে ফিরে আসা এই যাত্রা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। সরকারি দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, Toy Train বা DHR দার্জিলিংয়ের পর্যটন ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই লোকো শেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় এমন দুর্ঘটনা শুধু রেলকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতির উপরও তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চিন্তা তৈরি করে। বিশেষ করে পুজোর মরশুম সামনে। এই সময়ে দার্জিলিংয়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। Toy Train-এর Joy Ride বহু পর্যটকের ভ্রমণসূচির অন্যতম আকর্ষণ। ফলে পরিষেবা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে পর্যটন ব্যবসার উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

তার থেকেও বড় প্রশ্ন রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে। বুধবারের ঘটনা প্রথম নয়। চলতি বছরের ২১ জুন প্রবল বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ধস বা rockfall-এর জেরে এই ঐতিহাসিক লোকো শেডের একটি অংশ আগেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ফের একই পরিকাঠামোয় ক্ষতি হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

পাহাড়ে প্রবল বৃষ্টির সময় মাটি ও পাথরের উপর জলচাপ বাড়ে। পুরনো কাঠামো, পাহাড়ের ঢাল এবং আশপাশের ভূমির স্থিতিশীলতার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। দার্জিলিংয়ের মতো ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকায় রেল পরিকাঠামোর নিয়মিত structural audit এবং বর্ষার আগে বিশেষ নিরাপত্তা পরীক্ষা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হল আহত কর্মীদের সুস্থতা এবং যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রেল কর্তৃপক্ষের সামনে একই সঙ্গে দু’টি কাজ—ক্ষতিগ্রস্ত শেড দ্রুত মেরামত করা এবং কেন এই বিপর্যয় ঘটল, তার নিরপেক্ষ তদন্ত করা।

পরিষেবা কবে স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এবং নিরাপত্তা পরিদর্শনের ফলের উপর। রেল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, পরিস্থিতি মূল্যায়নের পরেই Joy Ride পরিষেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে বৃষ্টি নতুন কিছু নয়। বর্ষায় পাহাড়ি রেলপথে ধস, পাথর পড়া কিংবা পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। কিন্তু UNESCO-র বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা একটি ঐতিহাসিক রেল পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রতিটি এমন ঘটনা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু পুরনো ইঞ্জিন বা রেললাইন বাঁচিয়ে রাখার বিষয় নয়, তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি কাঠামো, কর্মী এবং যাত্রীর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ দিনের দুর্ঘটনায় বড় বিপদ এড়ানো গেলেও প্রশ্ন থেকে গেল। টানা বৃষ্টির মধ্যে যদি শেডের একটি অংশ আচমকা ভেঙে পড়তে পারে, তাহলে আগামী দিনে আরও বড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে এখনই কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

পাহাড়ে বৃষ্টি আপাতত থামেনি। আর দার্জিলিংয়ের ঐতিহাসিক টয় ট্রেনের ভবিষ্যৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করার আগে তাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার—নিরাপত্তা।