বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন ধর্মতলার মঞ্চ থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কলেজ স্কোয়ার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত তৃণমূলের মিছিল শেষে আয়োজিত জনসভায় তিনি একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্র ও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট বার্তা দেন, প্রশাসনিক স্তরে যতই বদল আনা হোক, রাজ্যের আমলারা শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষের স্বার্থেই কাজ করবেন।
রবিবার ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মিনাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। এরপর সোমবার সকালে কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার এবং রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি পীযূষ পাণ্ডেকেও বদল করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক, আর সেই বিতর্ককেই আরও তীব্র করে তুললেন মুখ্যমন্ত্রী।
ধর্মতলার সভা থেকে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন, গভীর রাতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা পর্যন্ত করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির স্বার্থরক্ষার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রসচিবকে সরানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, যোগ্য ও দক্ষ আধিকারিকদের শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তবে এই সমস্ত প্রশাসনিক বদল তৃণমূলকে দমাতে পারবে না বলেও স্পষ্ট করে দেন তিনি। মমতার কথায়, “যে অফিসারই পাঠান, তাঁরা বাংলার মানুষের পক্ষেই কাজ করবেন। বিজেপির নির্দেশে কিছু দিনের জন্য আইসি বা ডিএম বদল করা যেতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা বদলানো যায় না।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখেই নির্বাচনের ময়দানে নামছে তৃণমূল।
এদিনের সভায় রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এভাবে যদি রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে থাকে, তাহলে কি ভবিষ্যতে তাঁর বাড়ি বা কালীঘাটেও হামলা হতে পারে? এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্য নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মমতা বলেন, “দেশকে কীভাবে রক্ষা করবেন, সেটাই আগে ভাবুন। এই ধরনের মন্তব্য দেশের পক্ষে শোভন নয়।”
গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গেও কেন্দ্রকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষকে একের পর এক সমস্যার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নোটবন্দি থেকে আধার, বিভিন্ন পরিষেবার লাইনে দাঁড়ানো—এই ধারাবাহিক ভোগান্তির পর এখন আবার গ্যাসের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে বলেও মত তাঁর।
সভা শেষের দিকে আত্মবিশ্বাসী সুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, আসন্ন নির্বাচনে আরও বেশি আসন নিয়ে তৃণমূল আবার ক্ষমতায় ফিরবে। বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “মানুষ সব দেখছে। এবার তৃণমূল আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে।” তাঁর শেষ বার্তা ছিল স্পষ্ট—“আবার দেখা হবে, নবান্নে দেখা হবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের মুখে প্রশাসনিক বদল, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সংঘাত—এই তিনটি ইস্যুকেই সামনে রেখে লড়াইয়ের ময়দানে নামছে তৃণমূল। অন্যদিকে বিজেপিও পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোয় রাজ্যের রাজনীতি যে আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
Comments (0)