বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর এখন রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির মূল ফোকাস একটাই—সংখ্যার খেলা। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক শিবিরগুলিতে শুরু হয়েছে হিসাবনিকাশ। হাতে সময় খুব বেশি নেই, তাই সংগঠন গোছানোর পাশাপাশি এবার জোর দেওয়া হচ্ছে আগের নির্বাচনের ভোট শতাংশের বিশ্লেষণে। পশ্চিম বর্ধমান জেলা এই মুহূর্তে সেই রাজনৈতিক অঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
এই জেলায় মোট বিধানসভা আসন নয়টি। তার মধ্যে আসানসোল মহকুমায় সাতটি এবং দুর্গাপুরে রয়েছে দুটি আসন। বর্তমানে এই নয়টির মধ্যে ছ’টি আসন রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে, আর তিনটি বিজেপির। শুধু তাই নয়, আসানসোল এবং দুর্গাপুর-বর্ধমান—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ লোকসভা আসনও শাসকদলের দখলে রয়েছে। ফলে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকলেও, প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জকে হালকাভাবে নিচ্ছে না তৃণমূল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিম বর্ধমানে তৃণমূলের গড় ভোটের হার ছিল ৪৪.৫ শতাংশ, যেখানে বিজেপি পেয়েছিল ৪২.৩ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র দুই শতাংশের কিছু বেশি। বাম শিবির প্রায় আট শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল। এই পরিসংখ্যানই এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলও একই ছবি তুলে ধরে। সেখানে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৫.২ শতাংশ ভোট, আর বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছিল ৪২.৭ শতাংশ। এখানেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এই জেলায় ভোটের লড়াই বরাবরই কাছাকাছি এবং অনিশ্চিত।
পঞ্চায়েত নির্বাচনেও তৃণমূলের প্রভাব স্পষ্ট। জেলার ৬২টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ৫১টি তৃণমূলের দখলে, বিজেপির হাতে রয়েছে ১০টি এবং বামেদের মাত্র একটি। আটটি পঞ্চায়েত সমিতির সবকটিই শাসকদলের নিয়ন্ত্রণে। জেলা পরিষদও তৃণমূলের হাতে। এই শক্তিশালী সংগঠনই আসন্ন নির্বাচনে বড় ভূমিকা নেবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল নেতৃত্ব যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। জেলা সভাপতি নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী মনে করছেন, গতবারের ভোট শতাংশ ধরে রাখতে পারলেই জয় নিশ্চিত। তাঁর কথায়, সংগঠন এবং উন্নয়ন—এই দুই অস্ত্র নিয়েই তাঁরা ভোটের ময়দানে নামবেন। অন্যদিকে, আসানসোল উত্তরের প্রার্থী ও প্রাক্তন মন্ত্রী মলয় ঘটকও উন্নয়নকেই হাতিয়ার করতে চাইছেন। গত পাঁচ বছরে শিল্পাঞ্চলে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিই মানুষের কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
তবে পিছিয়ে নেই বিজেপিও। তারা স্পষ্টই জানাচ্ছে, মাত্র দুই শতাংশের ব্যবধান মুছে ফেলা খুব কঠিন নয়। জেলা সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্যের দাবি, গত কয়েক বছরে শাসকদলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে রেখেই তারা ভোট বাড়াতে চাইছে। তাঁর মতে, গতবারের মতো পরিস্থিতি এবার থাকবে না এবং ভোটার তালিকার পরিবর্তনও তাদের পক্ষে যেতে পারে।
বিজেপির দাবি, আগের নির্বাচনে ভুয়ো ভোটারের ভূমিকা ছিল এবং এবার বহু নাম বাদ পড়ায় সমীকরণ বদলাতে পারে। প্রায় তিন লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন বলে দাবি তাঁদের, এবং বিবেচনাধীন আরও অনেক নাম বাদ পড়তে পারে। এই পরিবর্তনই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে গেরুয়া শিবির।
সব মিলিয়ে পশ্চিম বর্ধমান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। এখানে ভোট শতাংশের সামান্য ওঠানামাই নির্ধারণ করে দিতে পারে জয়-পরাজয়। তাই দলগুলি এখন শুধু প্রচারে নয়, অঙ্ক কষাতেও সমান জোর দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যার খেলা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।
Comments (0)