কলকাতা টাইমস নিউজ : নিউজ ডেস্ক :কলকাতা :১৯মার্চ ২০২৬
বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দেখা দিল অসন্তোষের ঝড়। দীর্ঘদিনের সংগঠক, একাধিক সিটিং বিধায়ক এবং জেলা স্তরের প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে টিকিট না পাওয়া বা কেন্দ্র পরিবর্তন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, সোশ্যাল মিডিয়ায় তির্যক মন্তব্য এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সক্রিয় হয়েছে দলীয় নেতৃত্ব। কলকাতা থেকে ক্ষুব্ধ নেতাদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—সংযত থাকতে হবে এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। সেই বার্তা পৌঁছতেই অনেক ক্ষেত্রেই সুর নরম করতে দেখা গিয়েছে নেতাদের একাংশকে। তবে এখনও কিছু ক্ষেত্রে বিক্ষোভ থামেনি, যা নেতৃত্বের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ক্ষোভের তালিকায় উঠে এসেছে একাধিক নাম। খগেশ্বর রায়, অসিত মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, রফিকুর রহমান, মনিরুল ইসলাম, তজমুল হোসেন, তপন চট্টোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন ব্যাপারী এবং সৌরভ চক্রবর্তীর মতো নেতারা বিভিন্নভাবে তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কারও টিকিট কাটা হয়েছে, আবার কারও ক্ষেত্রে কেন্দ্র বদলের সিদ্ধান্তেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে শওকত মোল্লার প্রার্থিতা ঘিরে। ক্যানিং পূর্ব থেকে সরিয়ে তাঁকে ভাঙড়ে প্রার্থী করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে তাঁর অনুগামীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় স্তরে বিক্ষোভও দেখা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ধরনের কেন্দ্র পরিবর্তন অনেক সময় সংগঠনের ভিত নড়বড়ে করে দিতে পারে, যা ভোটের আগে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চুঁচুড়ার বিদায়ী বিধায়ক অসিত মজুমদারের ক্ষোভও প্রকাশ্যে এসেছে। প্রথমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেও পরে তিনি জানিয়েছেন, দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তিনি পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত অসন্তোষ থাকলেও দলীয় অবস্থান নিয়ে তিনি দ্বিধায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় দলীয় সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে জানান, সমীক্ষা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতেই প্রার্থী তালিকা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, ছোটখাটো ক্ষোভ স্বাভাবিক, তবে শেষ পর্যন্ত সবাইকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনেই চলা উচিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তাঁর নিজের কেন্দ্রও পরিবর্তন করা হয়েছে, তবুও তিনি তা মেনে নিয়েছেন।
তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি এতটা মসৃণ নয়। পূর্বস্থলী উত্তরের তপন চট্টোপাধ্যায় এবং উত্তরবঙ্গের প্রভাবশালী নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ টিকিট না পেয়ে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দলীয় নেতৃত্বের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে।
হরিশচন্দ্রপুরে বিদায়ী মন্ত্রী তজমুল হোসেনের নেতৃত্বে প্রকাশ্য বিক্ষোভও দেখা গিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দল তাঁর সঙ্গে অবিচার করেছে। একইভাবে আমডাঙায় রফিকুর রহমানের অনুগামীরাও প্রার্থী বদলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। যদিও রফিকুর নিজে দলীয় অবস্থান বজায় রাখার কথাই জানিয়েছেন, তবে জয়ের ব্যাপারে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।
আলিপুরদুয়ারে সৌরভ চক্রবর্তীর সোশ্যাল মিডিয়ায় ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও পরে তিনি সেই পোস্ট মুছে দেন, যা থেকে বোঝা যায় নেতৃত্বের বার্তা কার্যকর হয়েছে কিছুটা হলেও।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, যাঁরা প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যেই অবস্থান নরম করেছেন। তবে কয়েকজন এখনও অনড় রয়েছেন এবং তাঁদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রয়োজন হলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর তৃণমূলের অন্দরের এই বিক্ষোভ দলীয় ঐক্যের প্রশ্নে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন নজর থাকবে, নেতৃত্ব কত দ্রুত এই অসন্তোষ সামাল দিতে পারে এবং ভোটের ময়দানে সংগঠনকে কতটা একসুতোয় বাঁধতে পারে।
Continue With Google
Comments (0)