কলকাতা টাইমস নিউজ  : নিউজ ডেস্ক  :কলকাতা :২১ মার্চ ২০২৬

কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আশায় এসে যে এমন বিভীষিকার মুখোমুখি হতে হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ট্রমা কেয়ার ভবনের একটি লিফটে ঘটে গেল শিউরে ওঠার মতো দুর্ঘটনা। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে প্রাণ হারালেন এক তরুণ বাবা। তাঁর শেষ চিৎকার—‘বাঁচাও, বাঁচাও’—আজও যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছে হাসপাতালের করিডর।

মৃতের নাম অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বয়স মাত্র চল্লিশ। দমদমের বাসিন্দা অরূপ তাঁর চার বছরের ছেলেকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে ছুটে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। ঘরের উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে, যখন খেলার ছলে পড়ে গিয়ে শিশুটির হাত ভেঙে যায়। দ্রুত চিকিৎসার আশায় পরিবার নিয়ে তাঁরা পৌঁছন আরজি করের ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে।

চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, শিশুটির অস্ত্রোপচার করতে হবে। সেই প্রস্তুতির মধ্যেই ভোরের দিকে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে অরূপ ওঠেন ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের ২ নম্বর লিফটে। উদ্দেশ্য ছিল উপরের তলায় যাওয়া। কিন্তু লিফট যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কোনও নির্দেশ ছাড়াই তা কখনও উপরে, কখনও নিচে ওঠানামা করতে থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের দাবি, লিফট একাধিক তলায় থামলেও দরজা খোলেনি। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লিফটের ভিতর আটকে ছিলেন তিনজন। একসময় লিফট বেসমেন্টে গিয়ে থামে, দরজা খোলে বটে, কিন্তু বাইরে গ্রিলের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় বেরোনোর কোনও পথ ছিল না।

পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যখন লিফট হঠাৎ মাঝপথে থেমে দরজা খুলে যায়। সেই সুযোগে অরূপ প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানকে বাইরে বের করে দেন। মা ও ছেলে প্রাণে বাঁচলেও আহত হন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অরূপ নিজে বেরোতে যাওয়ার সময়। তাঁর শরীরের একটি অংশ লিফটের বাইরে থাকতেই দরজা আচমকা বন্ধ হয়ে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে লিফট নিচের দিকে নেমে যায়। চলন্ত লিফট ও ফ্লোরের মাঝে চেপে গিয়ে মারাত্মক আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁর শরীর।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উঠে এসেছে, তাঁর পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছে, হাত-পা চূর্ণ হয়েছে এবং হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভারসহ একাধিক অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ছিঁড়ে গিয়েছে—যা প্রমাণ করে, আঘাত ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।

পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মীদের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বেসমেন্টের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় উদ্ধারকাজে আরও বিলম্ব হয় বলে দাবি পরিবারের।

এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ক্ষোভ ছড়িয়েছে। পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মামলা রুজু হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায়। পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে তিনজন লিফটম্যান এবং দুইজন নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন। তদন্তভার এখন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হাতে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফেও স্বীকার করা হয়েছে, লিফটের প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকতে পারে। কীভাবে মাঝপথে দরজা খুলল এবং কেন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ওঠানামা করছিল লিফট, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে পুরো ঘটনার পুনর্গঠন করার চেষ্টা চলছে।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর আবারও প্রশ্নের মুখে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একদিকে চিকিৎসার আশ্রয়স্থল, অন্যদিকে সেই জায়গাতেই প্রাণ হারানোর ভয়—এই দ্বৈত বাস্তবতা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একাধিক গাফিলতির মর্মান্তিক ফল—এমনটাই মনে করছেন অনেকেই। এখন অপেক্ষা, তদন্ত কতটা দ্রুত শেষ হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কারণ, এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—এমন ঘটনা আর যেন না ঘটে।