কলকাতা টাইমস নিউজ  :নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা :১৩ ডিসেম্বর

আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার আশায় শনিবার সকাল থেকেই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ঢল নামিয়েছিলেন হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী। টিকিটের মূল্য ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি, তবুও ভক্তদের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু মেসি মাঠে প্রবেশ করার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। মাঠের চারপাশে মন্ত্রী, আমলা, আমন্ত্রিত অতিথি এবং আয়োজকদের ঘন ভিড়ের কারণে দর্শকদের সামনে তিনি কার্যত অদৃশ্য হয়ে পড়েন। এমনকি জায়ান্ট স্ক্রিনেও তাঁকে স্পষ্ট দেখা যায়নি।

মেসি যখন সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে স্টেডিয়ামে পৌঁছন, তখন তাঁর হাসিমুখ এবং হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোর দৃশ্যই ছিল সেই দিনের একমাত্র দেখা। গাড়ি থেকে নামার পরই তাঁকে ঘিরে ধরা হয় এত ঘন ভিড়ে যে সামান্য চলার জায়গাও ছিল না। ছবি তোলার প্রতিযোগিতা, ভিআইপি–দের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং নিরাপত্তা ঘেরাটোপের ভেঙে পড়া—সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় অরাজক পরিস্থিতি। প্রায় ২০ মিনিট ধরে গ্যালারির দর্শকেরা তাঁর মুখও দেখতে পাননি। হতাশা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে এবং দেখা যায় “We want Messi” স্লোগান।

পরিচয় পর্বেও একই বিশৃঙ্খলা বজায় ছিল। প্রাক্তন মোহনবাগান ও ডায়মন্ড হারবার ফুটবলারদের সঙ্গে পরিচয়ের মুহূর্তেও রাজনৈতিক নেতা ও আয়োজকদের ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে মেসি ক্রমাগত আড়ালে থেকে যান। ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং আয়োজক শতদ্রু দত্ত বারবার মাইকে অনুরোধ করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই স্টেডিয়ামের ভিতরে লাঠিচার্জ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দর্শকদের ক্ষোভ তখন তুঙ্গে। অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “হাজার হাজার টাকা খরচ করলাম, মেসিকে দেখতে পেলাম না! আমরা কি নেতাদের দেখতে এসেছি?”

সকাল ১১টা ৫২ মিনিটে মেসিকে দ্রুত মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শাহরুখ খান এবং সৌরভ গাঙ্গুলি স্টেডিয়ামে পৌঁছননি। মেসির চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকদের রাগ চরমে ওঠে এবং গ্যালারিতে ভাঙচুর শুরু হয়। হোর্ডিং ছিঁড়ে ফেলা হয়, চেয়ার মাঠে ছুড়ে মারা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, সেই মুহূর্তে গ্যালারিতে যথেষ্ট পুলিশ উপস্থিত ছিলেন না।

ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এই ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং অপ্রত্যাশিত।” তিনি ক্রীড়া প্রেমীদের কাছে ক্ষমা চান এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করেন। এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসিম কুমার রায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকবেন রাজ্যের মুখ্যসচিব ও হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। কমিটি ঘটনার সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে দায় নির্ধারণ করবে।

এদিকে রাজ্যের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইনশৃঙ্খলা) জাওয়েদ শামিম জানান, ইভেন্টের প্রধান আয়োজক শতদ্রু দত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, টিকিট ক্রেতাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

একটি আন্তর্জাতিক তারকার সফরকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা দিনের শেষে পরিণত হলো হতাশা, ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায়। এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে—এ ধরনের আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত কি কলকাতা ?