কলকাতা টাইমস নিউজ  : নিউজ ডেস্ক  :কলকাতা :১৬ মার্চ ২০২৬

রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের আবহে এক অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল রাজ্য রাজনীতিতে। তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোষিত অবস্থান না মেনেই রাষ্ট্রপতির প্রাতরাশে যোগ দিলেন দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়। সোমবার রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত এই প্রাতরাশ বৈঠকে তৃণমূলের অন্য কোনও সাংসদ উপস্থিত না থাকলেও, দমদমের সাংসদ সৌগতের উপস্থিতি নিয়ে দলের অন্দরেই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।

ঘটনার পটভূমি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে একটি আদিবাসী সম্মেলনে রাজ্য সরকারের আয়োজন নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর প্রতিনিধিত্বকারী কোনও মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এই ঘটনার পর থেকেই রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যের শাসকদলের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতেই ১৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির প্রাতরাশ বৈঠকের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল। দলের তরফে জানানো হয়, পবিত্র রমজান মাসে অনেক সাংসদ রোজা রাখছেন, ফলে এই সময়ে এমন বৈঠক আয়োজন উপযুক্ত নয়। রাজ্যসভার মুখ্য সচেতক নাদিমুল হক রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে এই অবস্থানের কথা জানান এবং অনুরোধ করেন, এই ধরনের বৈঠক ইদের পর আয়োজন করা হোক।

কিন্তু সেই ঘোষিত অবস্থানের মধ্যেই ভিন্ন সুর শোনা গেল সৌগত রায়ের পদক্ষেপে। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে রাষ্ট্রপতি ভবনে উপস্থিত হন এবং প্রাতরাশের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎও করেন। পরে তিনি সংসদ অধিবেশনেও যোগ দেন। তাঁর এই পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি দলের অভ্যন্তরে মতভেদ রয়েছে?

এই বিষয়ে সৌগত রায়ের বক্তব্য, তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলেই তিনি গিয়েছেন। তাঁর দাবি, দল তাঁকে যাওয়ার নির্দেশ দেয়নি, আবার বারণও করেনি। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা নিয়ে দলের ভেতরেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

লোকসভায় তৃণমূলের ডেপুটি লিডার শতাব্দী রায় এই প্রসঙ্গে খানিকটা হালকা সুরে মন্তব্য করেছেন, সৌগত রায় অনেক সময়েই দলের অবস্থান থেকে আলাদা পথে হাঁটেন এবং এই বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতৃত্বই ভালো বোঝেন। তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট, বিষয়টি দলীয় স্তরে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে তৃণমূল সূত্রে জানানো হয়েছে, এই প্রাতরাশে যোগদান নিয়ে দলের পক্ষ থেকে কোনও হুইপ জারি করা হয়নি। ফলে সাংসদদের উপর বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেই কারণে সৌগত রায়ের উপস্থিতিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছে দল। তবে বিরোধী শিবির এই ঘটনাকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছে। বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গার দাবি, সৌগত রায় আগেও একাধিকবার দলের ঘোষিত অবস্থানের বাইরে গিয়ে মন্তব্য বা পদক্ষেপ করেছেন।

এই ঘটনার মধ্যেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবারও আবেদন জানানো হয়েছে। সোমবার রাষ্ট্রপতির কাছে নতুন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে খবর। এর আগেও গত সপ্তাহে দু’টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল, তবে এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের তরফে কোনও জবাব মেলেনি।

সব মিলিয়ে, একদিকে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্য সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরে এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ—দুটি বিষয়ই এখন রাজ্য রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আগামী দিনে এই ঘটনা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা চলছেই।