কলকাতা টাইমস নিউজ :নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা :১৩ ডিসেম্বর
বিস্তারিত দেবজিৎ গাঙ্গুলির কলমে :দার্জিলিঙের পাহাড়ি রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি সেতু—টুংসুংখোলা নদীর উপর তৈরি ‘গোর্খাল্যান্ড সেতু’। তিন মাস আগেই ভয়াবহ দুর্যোগে ভেঙে পড়েছিল দুধিয়া সেতু। প্রশাসনের মাধ্যমে নতুন সেতু গড়ার কাজ শুরু হয়নি সেভাবে। তার মধ্যেই স্থানীয়দের চাঁদা তুলে তিন মাসের মধ্যে বিজনবাড়ির কাছে তৈরি হয়ে গেল একটি কংক্রিটের সেতু। নাম দেওয়া হয়েছে ‘গোর্খাল্যান্ড সেতু’। আর এই নামকরণ ঘিরেই ফের উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে পাহাড়ি রাজনীতি।
ভৌগোলিক ভাবে সেতুর এক প্রান্ত বিজনবাড়ি ব্লকের মূল এলাকা, অন্য প্রান্ত টুংসুং চা-বাগান। মাঝখানে পাহাড়ি নদী টুংসুংখোলা। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেতু এখানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি যেন ভোটের আগে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়ার একটি প্রতীকী প্রয়াস।
সেতুর উদ্বোধন করেন অজয় এডওয়ার্ড—যিনি চার বছর আগেই হামরো পার্টির মাধ্যমে দার্জিলিং পুরসভা দখল করে পাহাড়ের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিলেন। পরে দল ভেঙে যায়, ক্ষমতাও হাতছাড়া হয়। নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট’ গড়ে ওঠে তাঁর উদ্যোগেই। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে অজয়ের দল এই সেতু নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত নয়—তবুও পাহাড়ের বহু মানুষই বলছেন, “এই সেতু আসলে অজয় এডওয়ার্ডের সেতু—ভোটের আগে মানুষের মন ছোঁয়ার সেতু।”
এই সেতুর নামেই স্পষ্ট রাজনীতির আভাস—“গোর্খাল্যান্ড” শব্দবন্ধ ব্যবহার। দার্জিলিঙের রাজনীতি টেনে তুলতে হলে এই শব্দের আবেগ ছুঁতে হয়, এমনটাই মনে করা হয় পাহাড়ি মহলে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল গত কয়েক বছর ধরে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন শান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু অজয়ের নতুন প্রচেষ্টা সেই আবেগকে আবার জাগিয়ে তুলছে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।
অন্যদিকে সেতুর অনুমতি ছাড়া নির্মাণের অভিযোগে ঠিকাদারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রশ্ন উঠছে—একটি কংক্রিট সেতু নির্মাণ এক দিনে হয় না। কয়েক মাস ধরে কাজ চলল, স্থানীয় প্রশাসন তা জানল না কীভাবে? উদ্বোধনের পরই দার্জিলিঙের আবগারি দপ্তর অজয়ের ‘গ্লেনারিজ পানশালা’ বন্ধের নোটিস জারি করেছে। অজয় এই পদক্ষেপের পিছনে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” দেখছেন।
অপরদিকে উত্তরবঙ্গের এক প্রাক্তন মন্ত্রীর মতে, “পাহাড়ে কেউ রাজনীতিতে পোক্ত হতে চাইলে ‘গোর্খাল্যান্ড’ শব্দটিকেই সামনে আনতে হয়। সম্ভবত অজয় সেই পথই নিচ্ছেন।” তৃণমূল এই ঘটনা দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। রাজ্যের এক বর্তমান মন্ত্রীর বক্তব্য—“অজয়ের প্রভাব দার্জিলিং শহরে আছে। কিন্তু কার্শিয়াং ও কালিম্পং-এ তাঁর ভিত্তি তেমন নেই। পাহাড়ের রাজনীতির দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রী অনীত থাপাকে দিয়েছেন, তাই আমরা বাইরে থেকে দেখছি।”
যদিও অজয়ের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর অনেকে কংগ্রেসপন্থী। ফলে তিনি পাহাড়ে তৃণমূল ও বিজেপির বাইরে একটি “তৃতীয় বিকল্প” তৈরি করতে চাইছেন বলেও মনে করা হচ্ছে। এক সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে—“গোর্খাল্যান্ড সেতু অজয়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের প্রথম ধাপ মাত্র।”
পাহাড়ের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে—গুরুং, বিনয় তামাং, শান্তা ছেত্রী—বহু নেতাই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রথমে উন্নয়ন বোর্ড তৈরি করে পাহাড় শান্ত করার চেষ্টা করেছিল। পরে তা ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রীর ভরসা এখন অনীত থাপা। সেই শান্ত পরিবেশেই এবার “গোর্খাল্যান্ড সেতু” নির্মাণ যেন নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন একটাই—এই সেতু কি অজয় এডওয়ার্ডের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সেতু হতে চলেছে? পাহাড়ে ভোটের আবহ যত ঘন হবে, এই প্রশ্ন ততই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
Continue With Google
Comments (0)