কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক :

পুজোর আগে ছুটির ক্যালেন্ডারে বড়সড় বদল। এতদিন ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার দিনটি নির্ধারিত ছিল। কিন্তু পঞ্জিকা অনুযায়ী এ বছর বিশ্বকর্মা পুজো পড়ছে ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। সেই কারণে পুরনো সিদ্ধান্ত সংশোধন করে এবার ১৮ সেপ্টেম্বরকেই পূর্ণদিবস সরকারি ছুটি ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ১৪ সেপ্টেম্বর অর্থ দফতরের অডিট শাখার জারি করা নতুন বিজ্ঞপ্তিতে এই পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির নম্বর ৩৪৪৬-F(P2)।

অর্থাৎ, সরকারি কর্মীদের এবার বৃহস্পতিবার নয়, শুক্রবার বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি। তার পরেই রয়েছে শনিবার ও রবিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে সরকারি কর্মীদের একাংশের জন্য পুজোর আগেই পরপর তিন দিনের ছুটির সুযোগ তৈরি হয়ে গেল। অবশ্য কোন দফতরে শনিবারের কর্মসূচি বা ছুটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট অফিসের নিয়মের উপর নির্ভর করবে।

এর আগে ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির যে মূল তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট ভাবে ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবারকে বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকাশিত ছুটির তালিকাতেও এতদিন ১৭ সেপ্টেম্বরই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন হিসেবে ছিল। কিন্তু পঞ্জিকা অনুযায়ী পুজোর দিন ১৮ সেপ্টেম্বর হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সেই তারিখ সংশোধন করা হল।

এই বছর বিশ্বকর্মা পুজোর তারিখ নিয়েই বেশ কিছুদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল। একাধিক পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে বিশ্বকর্মা পুজো পালিত হবে। ভাদ্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ সংক্রান্তির সঙ্গে এই পুজোর যোগ থাকায় পুজোর তারিখ নির্ধারণে পঞ্জিকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আনন্দবাজারের পঞ্জিকা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসারে ১৮ সেপ্টেম্বরকেই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বলা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি ছুটির তালিকা তৈরি হওয়ার সময় ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিকেই ছুটি হিসেবে রাখা হয়েছিল। ফলে পুজোর দিন এবং সরকারি ছুটির দিনের মধ্যে এক দিনের ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। সেই বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতেই এবার রাজ্য সরকারের তরফে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশিকায় আগের ১৭ সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে ১৮ সেপ্টেম্বর ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

নবান্নের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য সরকারের অধীন বিভিন্ন দফতর ও প্রতিষ্ঠানে শুক্রবার পূর্ণদিবস ছুটি থাকবে। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী রাজ্য সরকারের বিভিন্ন অফিসের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্থা, স্ট্যাটুটরি বডি, বোর্ড, কর্পোরেশন এবং রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা মালিকানাধীন সংস্থাগুলিও এই ছুটির আওতায় থাকবে। সরকারি ও সরকার-পোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও এই নির্দেশ কার্যকর হবে বলে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।

তবে ছুটির তালিকা নিয়ে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সরকারি ছুটি, স্কুলের ছুটি এবং ব্যাংকের ছুটির তালিকা এক নয়। রাজ্য সরকারের মূল ছুটির তালিকায় কোন দিন কোন ধরনের ছুটি হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তির উপর নির্ভর করে। তাই সাধারণ মানুষকে নিজেদের অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পৃথক নির্দেশিকাও দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বকর্মা পুজো বাংলার শিল্পাঞ্চল, কারখানা, গ্যারাজ, ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠানেই এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়। কারিগর, মিস্ত্রি, শিল্পী থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসায়ী—অনেকেই তাঁদের কাজের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির পুজো করেন। ফলে সরকারি ছুটির তারিখের এই পরিবর্তন সাধারণ কর্মীদের পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

এবারের পরিবর্তনের আরও একটি তাৎপর্য রয়েছে। শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ছুটি পড়ায় তার পরের দু’দিন শনিবার ও রবিবার। ফলে যাঁদের শনিবার-রবিবার নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি, তাঁদের জন্য বিশ্বকর্মা পুজোকে কেন্দ্র করে টানা তিন দিনের অবসর তৈরি হচ্ছে। পুজোর আগে স্বল্প সময়ের এই ছুটিকে কাজে লাগিয়ে অনেকে বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন, আবার কেউ কেউ পরিবার নিয়ে ছোট ভ্রমণের পরিকল্পনাও করতে পারেন। তবে রেল, বিমান বা দূরপাল্লার বাস পরিষেবায় যাত্রীচাপ বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষ করে কলকাতা এবং শিল্পাঞ্চলগুলিতে বিশ্বকর্মা পুজোর আলাদা আবহ রয়েছে। হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-বড় কারখানা ও ওয়ার্কশপে এই পুজোকে ঘিরে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। বহু জায়গায় কারখানা পরিষ্কার করা, যন্ত্রপাতি সাজানো এবং পুজোর আয়োজনের কাজ চলে কয়েক দিন ধরে। ফলে ছুটির তারিখের এই পরিবর্তন পুজোর প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও কিছুটা বাড়তি সময় ও সুবিধা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে জন্মাষ্টমীর পর বিশ্বকর্মা পুজোই ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারিত ছুটি। মূল তালিকায় ১৭ সেপ্টেম্বরের পর সরাসরি ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর ছুটি রয়েছে। তবে বিশ্বকর্মা পুজোর তারিখ পরিবর্তনের ফলে সেপ্টেম্বরের ছুটির ক্যালেন্ডারেও এখন পরিবর্তন এসেছে।

এর পরেই শুরু হয়ে যাবে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের প্রস্তুতি। অক্টোবর মাসে দুর্গাপুজোকে ঘিরে রাজ্য সরকারি ছুটির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যায়। সরকারি তালিকা অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর মহাচতুর্থী থেকে দুর্গাপুজোর ছুটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ১৬ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী। এরপরও ২২, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর দুর্গাপুজোর অতিরিক্ত ছুটি এবং ২৬ অক্টোবর লক্ষ্মীপুজোর অতিরিক্ত ছুটি রয়েছে।

ফলে সেপ্টেম্বরের এই সংশোধিত ছুটি কার্যত দুর্গাপুজোর আগের শেষ বড় সরকারি ছুটিগুলির একটি হয়ে উঠছে। বিশ্বকর্মা পুজো শেষ হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুজোর প্রস্তুতি আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ছুটির দিন বদলের পিছনে মূল কারণ হিসেবে রয়েছে পুজোর তারিখের সঙ্গে সরকারি ছুটির সামঞ্জস্য। আগে ঘোষিত ১৭ সেপ্টেম্বরের ছুটির পরিবর্তে এখন ১৮ সেপ্টেম্বরকে সরকারি ছুটি করার সিদ্ধান্ত সেই বিভ্রান্তি দূর করেছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আগের নির্দেশ সংশোধন করে নতুন তারিখ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, যাঁরা এতদিন ১৭ সেপ্টেম্বর ছুটি ধরে নিজেদের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের এবার নতুন নির্দেশ অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলাতে হবে। বৃহস্পতিবার আর সরকারি বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি নয়, ছুটি হবে শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর। আর সেই ছুটির সঙ্গে শনিবার ও রবিবার যুক্ত হওয়ায় তৈরি হচ্ছে সপ্তাহান্তের একটি ছোট বিরতি।

বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নিয়ে পঞ্জিকা এবং সরকারি ছুটির তালিকার মধ্যে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, নতুন বিজ্ঞপ্তিতে আপাতত তার অবসান ঘটল। এখন রাজ্যবাসীর কাছে হিসাবটা সহজ—১৭ সেপ্টেম্বর নয়, ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিশ্বকর্মা পুজোর সরকারি ছুটি।

পুজোর মরসুমের ঠিক আগে নবান্নের এই সিদ্ধান্তে সরকারি কর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলের কর্মীদের মধ্যেও স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। আর শুক্রবারের ছুটির সঙ্গে সপ্তাহান্তের দু’দিন যুক্ত হওয়ায় অনেকের কাছেই এই পরিবর্তন হয়ে উঠতে পারে পুজোর আগের ছোট্ট ‘ব্রেক’।