পরীক্ষা-শারীরিক সক্ষমতা পেরিয়ে অপেক্ষা ফলের, পুজোর আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার দাবি !
কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক:
পুজোর আর বেশি দেরি নেই। শহরের বাজারে যখন উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন কয়েক হাজার তরুণ-তরুণীর চোখ আটকে রয়েছে একটি ফলাফলের দিকে। হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান—“এ বার পুজোয় উর্দি চাই।” রাজ্য পুলিশের চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের এই দাবিতেই সোমবার সরগরম হয়ে উঠল কলকাতার রাজপথ। শিয়ালদহ থেকে শুরু হওয়া চাকরিপ্রার্থীদের মিছিল এগিয়ে পৌঁছয় ধর্মতলায়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিছিলে যোগ দেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীরা।
তাঁদের মূল দাবি একটাই—নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ দ্রুত শেষ করে ফল প্রকাশ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পুজোর আগেই তাঁদের হাতে নিয়োগের খবর দিতে হবে। কারণ, তাঁদের অনেকের কাছেই এই চাকরি শুধুমাত্র একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি লক্ষ্য।
চাকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, ২০২৪ সালে রাজ্য পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। তার পর দীর্ঘ প্রস্তুতির শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি নথিতেও এই পরীক্ষার তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০২৫ বলে উল্লেখ রয়েছে। রাজ্যজুড়ে ১১ হাজারেরও বেশি শূন্যপদের জন্য এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন।
লিখিত পরীক্ষার পর শুরু হয় নিয়োগের পরবর্তী ধাপ। চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের দাবি, তাঁরা শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষার ধাপ পেরিয়েছেন এবং পরবর্তী পর্যায়েও অংশ নিয়েছেন। কিন্তু শেষ ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় তাঁদের অপেক্ষা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। সেই অপেক্ষার বিরুদ্ধেই সোমবারের মিছিল।
প্রার্থীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করার পরও চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে স্পষ্ট কোনও সময়সীমা তাঁরা পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, ভোটের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে বলে আগে জানানো হয়েছিল। ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পরও যখন ফল প্রকাশ হয়নি, তখনই তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে শুরু করে। সেই ক্ষোভ এবার রাস্তায় এসে পড়েছে।
তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে শুধু ফল প্রকাশের প্রশ্নই নেই, আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজ্য পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক অভিযোগ আদালতে পৌঁছেছে। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টেও এই নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। সেখানে নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং মেধাতালিকা ও প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশের বিষয়েও আদালতে আলোচনা হয়েছে।
ফলে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে এখন ফল প্রকাশ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বহু প্রার্থী দীর্ঘ সময় ধরে অন্য কোনও চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে দূরে থেকেছেন বলে তাঁদের দাবি। কেউ নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করেছেন, কেউ লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে দিনের পর দিন সময় দিয়েছেন। পরীক্ষার পরও নিয়োগের আশায় তাঁরা অপেক্ষা করে রয়েছেন।
সোমবারের মিছিলের দৃশ্যেও সেই হতাশার ছবি স্পষ্ট ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার দিকে এগিয়ে যান চাকরিপ্রার্থীরা। কোথাও স্লোগান, কোথাও আবার প্রশাসনের কাছে দ্রুত ফল প্রকাশের আবেদন। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে একটি বাক্য—“এ বার পুজোয় উর্দি চাই।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পটা ধরা পড়েছে। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা পরীক্ষায় বসেছেন, প্রয়োজনীয় ধাপ পেরিয়েছেন, এখন তাঁরা শুধু ফল চান। পুজোর সময় নতুন জামাকাপড়ের সঙ্গে নতুন পরিচয়ও চান। একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, একজন পুলিশকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ চান।
চাকরিপ্রার্থীদের এই আন্দোলনের আরও একটি দিক রয়েছে। সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হয়, ততই পরীক্ষার্থীদের উপর মানসিক ও আর্থিক চাপ বাড়ে। বিশেষ করে যে সমস্ত পরীক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন, তাঁদের কাছে একটি নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার তারিখ থেকে চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষা তাঁদের পরিকল্পনাকেও অনিশ্চিত করে দেয়।
এদিকে West Bengal Police Recruitment Board-এর সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও সক্রিয় নিয়োগপ্রক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে। বোর্ডের সাম্প্রতিক নোটিসগুলিতে সংশোধিত OBC তালিকা, শূন্যপদের পরিবর্তন এবং নিয়োগ সংক্রান্ত অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বোর্ড নিজেও জানিয়েছে, নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য প্রার্থীদের সরকারি ওয়েবসাইটের বিজ্ঞপ্তিই অনুসরণ করা উচিত এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো যাচাই না-করা তথ্য এড়িয়ে চলা উচিত।
অর্থাৎ, একদিকে রাস্তায় চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন, অন্যদিকে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী। তাঁদের দাবি, যত দ্রুত সম্ভব স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা হোক এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হোক।
এই নিয়োগপ্রক্রিয়া ঘিরে আদালতের হস্তক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূর্ববর্তী পর্যায়ে হাইকোর্ট লিখিত পরীক্ষার নম্বর-সহ মেধাতালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিল বলে সংবাদরিপোর্টে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ার সংরক্ষণনীতি এবং মেধাতালিকা নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠেছে। ফলে প্রশাসনের সামনে এখন শুধু ফল প্রকাশের তাগিদ নয়, আদালতের নির্দেশ ও আইনি প্রক্রিয়া মেনে নিয়োগকে স্বচ্ছ রাখার দায়িত্বও রয়েছে।
চাকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। তাঁদের দাবি, যে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাঁরা অংশ নিয়েছেন, সেটি দ্রুত এবং স্বচ্ছ ভাবে শেষ করা হোক। ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় জানানো হোক। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তাঁদের ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় আটকে না থাকে।
শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা—কলকাতার ব্যস্ত রাজপথে সোমবারের মিছিল তাই শুধুমাত্র একটি চাকরির দাবির মিছিল ছিল না। এর সঙ্গে মিশে ছিল হাজার হাজার পরিবারের প্রত্যাশা। পরীক্ষার ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে প্রস্তুতি, পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা এবং পরবর্তী ধাপ—প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়, অর্থ এবং পরিশ্রমের হিসাবও ছিল এই আন্দোলনের মধ্যে।
আর পুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাঁদের প্রত্যাশা।
“এ বার পুজোয় উর্দি চাই”—এই স্লোগান তাই শুধু একটি প্ল্যাকার্ডের লেখা নয়। এটি অপেক্ষার শেষ চাওয়ার ভাষা।
তাঁদের আশা, উৎসবের আলো জ্বলার আগেই প্রশাসনের তরফে আসবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের ঘোষণা। হাতে পুজোর নতুন পোশাকের বদলে হয়তো থাকবে নতুন জীবনের নিয়োগপত্র। আর সেই দিনই বহু পরীক্ষার্থীর কাছে সত্যিই হয়ে উঠবে অন্যরকম এক উৎসব।
Continue With Google
Comments (0)