কলকাতা টাইমস নিউজ | নিউজ ডেস্ক | কলকাতা
উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতিতে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়াল প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সির স্বামী তথা বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন প্রভাবশালী কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তীর গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পত্তি, নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেআইনি সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই তদন্তের মুখে ছিলেন তিনি। বুধবার রাতে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার পরই পুরুলিয়া থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই আইনগত প্রক্রিয়া এড়ানোর চেষ্টা করছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। হাইকোর্টের নির্দেশের পর তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের সমস্ত আইনি বাধা সরে যায়। এরপরই অভিযান চালিয়ে তাঁকে পুরুলিয়া থেকে আটক করা হয়। তিনি কেন পুরুলিয়ায় ছিলেন, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তকারীদের একাংশের ধারণা, গ্রেপ্তার এড়াতেই তিনি কলকাতার বাইরে অবস্থান করছিলেন।
একই মামলায় অবশ্য কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন তাঁর স্ত্রী, জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সি। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত চার মাসের শিশুসন্তানের মা হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁকে আগাম জামিন মঞ্জুর করেছেন। তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে তদন্তকারী সংস্থার সামনে হাজিরা দিতে হবে।
তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলি যথেষ্ট গুরুতর। আদালতে রাজ্যের আইনজীবী দাবি করেন, রাজারহাট-নিউটাউন এবং সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রোমোটারদের কাছ থেকে তোলাবাজি, জমি দখল, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং বিভিন্ন বেআইনি উপায়ে বিপুল সম্পত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এমনকি কালিম্পংয়ের একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেও বিপুল অঙ্কের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছিল যাতে সম্পদের প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা যায়।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মীয়স্বজন ও বেনামি ব্যক্তিদের নামে স্থানান্তর করা হয়েছিল। নির্বাচনী হলফনামায় প্রকৃত সম্পত্তির তথ্য গোপন করারও অভিযোগ উঠেছে। এই আর্থিক লেনদেনের উৎস, সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের গতিপথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুধু এই মামলাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেবরাজ চক্রবর্তীর নাম একাধিক বিতর্কে উঠে এসেছে। নিয়োগ দুর্নীতি, তোলাবাজি, প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল-সহ বিভিন্ন অভিযোগে ইতিমধ্যেই তদন্ত চলছে। ফলে তাঁর গ্রেপ্তারিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।
ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, "একজন দস্যু গ্রেপ্তার হয়েছে। এবার এলাকার মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবেন।" তাঁর অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে এবং সেই সম্পদ গোপন করতে আত্মীয়দের নামে ও বেনামি সম্পত্তি তৈরি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক মামলার আবহে এই গ্রেপ্তারি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ককে উসকে দিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তদন্ত এখন কোন দিকে এগোয়, তাঁর আর্থিক লেনদেনের আরও কী তথ্য সামনে আসে এবং এই মামলায় আর কারও নাম জড়ায় কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে তদন্তকারী সংস্থা— সকলের।
Continue With Google
Comments (0)