কলকাতা টাইমস নিউজ ডেস্ক:

একাকিত্ব, অবহেলা আর সামাজিক চোখরাঙানির মাঝেও কি বয়সের শেষবেলায় মানুষ নতুন করে ভালোবাসতে পারে? সোমনাথ সেনের ‘পাখির বাসা’ সেই প্রশ্নই ছুঁয়ে যেতে চলেছে বড়পর্দায়।

 

সংসার আছে, ঘর আছে, আপনজন আছে—তবু কোথাও যেন নেই নিজের মানুষ। চার দেওয়ালের মধ্যে বসবাস করেও কখনও কখনও একজন মানুষ হয়ে ওঠেন নিঃসঙ্গতম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিঃসঙ্গতা আরও গভীর হয়। সন্তানরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সম্পর্কের জায়গা দখল করে নেয় প্রয়োজন আর হিসেব-নিকেশ। অথচ মানুষের ভিতরের যে সঙ্গী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, তা বয়সের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং অনেক সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সেই চেনা অথচ খুব কম আলোচিত বাস্তবতাকেই গল্পের কেন্দ্রে রেখে তৈরি হয়েছে সোমনাথ সেন পরিচালিত বাংলা ছবি ‘পাখির বাসা’। ছবিটি মনোময় এবং পরমার গল্প। দুই পরিণত বয়সের মানুষ, দু’জনেই জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন, দু’জনেই হারিয়েছেন তাঁদের জীবনসঙ্গীকে। কিন্তু তাঁদের গল্প থেমে যায়নি। বরং জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁরা খুঁজে পান এমন এক সম্পর্কের সম্ভাবনা, যার নাম হতে পারে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব কিংবা একসঙ্গে বাঁচার ইচ্ছা।

‘পাখির বাসা’র গল্পের মনোময় একজন অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি চাকরিজীবী। স্ত্রীকে হারানোর পর তাঁর সংসার বলতে একমাত্র ছেলে হৃদয় এবং পুত্রবধূ জুঁই। বাইরে থেকে দেখলে এটিই একটি স্বাভাবিক পরিবারের ছবি। কিন্তু ঘরের ভিতরের সম্পর্কের সমীকরণ একেবারেই অন্যরকম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মনোময়কে নিজের বাড়িতেই প্রতিনিয়ত শুনতে হয় গঞ্জনা, অবহেলা এবং মানসিক লাঞ্ছনা। যে সন্তানকে মানুষ করতে তিনি নিজের জীবনের সেরা সময়টা দিয়েছেন, সেই সন্তানের কাছেই যেন তিনি আজ বাড়তি বোঝা।

এই অন্ধকার সংসারে মনোময়ের পাশে দাঁড়ায় গোপাল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মনোময়ের পালিত ছেলে গোপালই যেন তাঁর প্রকৃত আপনজন। মনোময়ের একাকিত্ব, কষ্ট এবং অপমান সে বুঝতে পারে। কিন্তু হৃদয় এবং জুঁই গোপালকে পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নিতে পারে না। তাঁদের চোখে গোপাল শুধুই একজন কর্মচারী বা চাকর। ফলে মনোময়ের সংসারে অশান্তি আরও ঘনীভূত হয়।

অন্যদিকে রয়েছে পরমার জীবন। স্বামীহারা পরমারও সংসার একসময় ছিল। তাঁর একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর সন্তানদের নিজেদের সংসার হয়েছে। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক যেন প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার সময় নেই, কিন্তু প্রয়োজন পড়লে পরমার দরজায় কড়া নাড়তে দ্বিধা নেই।

এই নিঃসঙ্গ জীবনে পরমার সবচেয়ে বড় আশ্রয় তাঁর কাজের মহিলা মল্লিকদি। রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু যত্ন আছে। পরমার একাকিত্ব, তাঁর অভিমান, তাঁর না-বলা কথাগুলির অনেকটাই বুঝতে পারেন মল্লিকদি।

শিক্ষিতা, পরিণত এবং আত্মসম্মানী পরমা নিজের মতো করে জীবন কাটিয়ে চলেছেন। কিন্তু একাকিত্ব যে কতটা নিঃশব্দে একজন মানুষকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে, তাঁর চরিত্রে সেই বাস্তবতাই ফুটে ওঠে। আর ঠিক তখনই তাঁর জীবনে প্রবেশ করে মনোময়।

দু’জনের পরিচয় যেন দুই অসম্পূর্ণ জীবনের হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে যাওয়া। কেউ কাউকে বাঁচাতে আসেন না। বরং দু’জনেই নিজেদের নিঃসঙ্গতা থেকে বেরিয়ে এসে একে অপরের মধ্যে খুঁজে পান কথা বলার একজন মানুষ, পাশে থাকার একজন সঙ্গী এবং নতুন করে জীবনকে দেখার সাহস।

এখানেই ‘পাখির বাসা’ শুধুমাত্র একটি পারিবারিক ছবি হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে বয়স, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে একটি সামাজিক প্রশ্ন।

সমাজ কি শুধুই তরুণ বয়সের প্রেমকে স্বীকৃতি দেবে? বিধবা বা বিপত্নীক একজন মানুষ কি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে ভালোবাসার অধিকার হারিয়ে ফেলেন? সন্তানরা যদি তাঁদের বাবা-মায়ের একাকিত্ব বুঝতে না পারেন, তাহলে কি তাঁদের নতুন করে জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার নেই?

ছবির গল্প এই প্রশ্নগুলির সরাসরি উত্তর না দিয়ে দর্শককে ভাবার জায়গা তৈরি করতে চায়। প্রকাশিত ছবির প্রাথমিক পরিচিতিতেও পরিচালক সোমনাথ সেনের এই সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর জোর দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। একদিকে ভেঙে যাওয়া পারিবারিক বন্ধন, অন্যদিকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এই দ্বন্দ্বই ছবির অন্যতম প্রধান সুর।

‘পাখির বাসা’ নামটিও যেন সেই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। পাখি যেমন একটি ছোট্ট বাসা তৈরি করে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, মানুষও সারাজীবন খুঁজে ফেরে নিজের একটি ঘর। কিন্তু সেই ঘর কি শুধুই ইট-কাঠের চার দেওয়াল? নাকি ঘর মানে এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের কথা বলা যায়, যার পাশে বসে নীরব থাকলেও অস্বস্তি হয় না?

মনোময় এবং পরমার সামনে শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নই দাঁড়ায়—তাঁরা কি পুরনো সংসারের স্মৃতি, সন্তানদের অবহেলা এবং সমাজের চোখরাঙানি পেরিয়ে নিজেদের জন্য নতুন একটি ‘বাসা’ তৈরি করতে পারবেন?

ছবির কাস্টও যথেষ্ট নজরকাড়া। মনোময় ও পরমার চরিত্রে রয়েছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী এবং পাপিয়া অধিকারী। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন মৌবনী সরকার, কন্যাকুমারী, মৌসুমী ভট্টাচার্য, বোধিসত্ত্ব মজুমদার, সান্ত্বনা বসু, দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য জ্যাক, শর্মিষ্ঠা মুখার্জি, অভিরাজ, দেব মণ্ডল-সহ আরও অনেকে।

ছবির নির্মাণেও রয়েছে একঝাঁক পরিচিত শিল্পীর অংশগ্রহণ। চিত্রনাট্য লিখেছেন সজল ঘোষ। চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে তীর্থ মিত্র, সম্পাদনায় দীপক মণ্ডল এবং রং বিন্যাসে সুজয় কুমার মিশ্র। সংগীত ও আবহ সংগীতের দায়িত্বে রয়েছেন চন্দন রায় চৌধুরী। নেপথ্য কণ্ঠে রয়েছেন সুজয় ভৌমিক এবং ডা. উৎসব দাস। গীত রচনায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সোমনাথ সেন। ছবিটি নিবেদন করছে সৃজা ফিল্মস এবং প্রযোজনা করেছেন চন্দন দে। গল্প ও পরিচালনায় সোমনাথ সেন।

ছবিটির নির্মাণ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক বাংলা সিনেমায় পারিবারিক সম্পর্ক, একাকিত্ব এবং প্রজন্মের দূরত্ব নিয়ে গল্প নতুন নয়। কিন্তু ‘পাখির বাসা’র বিশেষত্ব হল, এখানে পরিণত বয়সের মানুষদের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে গল্পের কেন্দ্রস্থলে রাখা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছবিটিকে এমন একটি পরিবারের গল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভিতরে জমে রয়েছে অশান্তি ও অবহেলা।

আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে সন্তানরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত। শহুরে জীবনে একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য আলাদা ঘর রয়েছে, কিন্তু অনেক সময় তাঁদের জন্য নেই আলাদা সময়। তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে যায়, কিন্তু পৌঁছয় না মনোযোগ। এই বাস্তবতার মধ্যেই ‘পাখির বাসা’ দর্শকের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় আয়না তুলে ধরতে পারে।

মনোময় ও পরমার গল্প তাই শুধু প্রেমের গল্প নয়। এটি নিজের জীবনের উপর নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার গল্প। এটি এমন দু’জন মানুষের গল্প, যারা অনেক কিছু হারিয়েও বিশ্বাস করতে চান যে জীবন এখনও তাঁদের জন্য কিছু রেখে দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায়—পাখিরা যেমন পুরনো বাসা ছেড়ে কখনও নতুন ডালে নতুন বাসা বাঁধে, মানুষও কি তেমন করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নতুন করে ঘর বাঁধতে পারে?

‘পাখির বাসা’ সেই উত্তরই খুঁজবে। আর সেই উত্তর হয়তো শুধু মনোময় ও পরমার জন্য নয়, তাঁদের মতো অসংখ্য নিঃসঙ্গ মানুষের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

 

 

 

‘Pakhir Basa’: When Two Lonely Lives Find a Reason to Begin Again

Somnath Sen’s Bengali film explores loneliness, family neglect and the possibility of finding companionship late in life.

Kolkata Times News Desk:

Can a person fall in love again after losing a life partner? Can two people who have already crossed the greater part of their lives choose companionship without worrying about social expectations? These are some of the questions at the heart of ‘Pakhir Basa’, the upcoming Bengali film directed by Somnath Sen.

The film revolves around Manomoy and Paroma, two widowed individuals whose lives appear settled from the outside but are marked by deep loneliness.

Manomoy is a retired private-sector employee. After losing his wife, he lives with his only son Hriday and daughter-in-law Jui. Yet the house that should have been his emotional refuge has become a place of humiliation and neglect. The people closest to him fail to understand his emotional needs.

The only person who genuinely stands beside him is Gopal, his adopted son. But Hriday and Jui do not accept Gopal as a family member and treat him merely as a servant. The resulting tension creates a deeply troubled household.

Paroma has a similar story. A widow with a son and daughter, she has watched her children build their own married lives. They rarely enquire about her wellbeing and appear at her doorstep mainly when they need something. Her domestic helper Mallikdi becomes her most dependable companion.

Educated and graceful, Paroma nevertheless lives with a profound sense of loneliness.

Her life changes when Manomoy enters it.

Their relationship is not presented simply as a conventional romance. Instead, the film explores the human need for companionship, conversation, affection and dignity. Two people who have already experienced loss discover that life may still offer them another opportunity.

This makes ‘Pakhir Basa’ more than a family drama. It raises uncomfortable social questions about ageing, widowhood, loneliness and personal freedom.

Society often accepts romance when people are young, but becomes uncomfortable when older people seek companionship. The film asks whether a widow or widower should be expected to live the rest of life alone simply because their children have grown up and society has established certain expectations.

The title itself carries a metaphorical significance. A bird builds a nest for shelter, warmth and companionship. Human beings also spend their lives searching for a place they can truly call home. But home is not necessarily a building. Sometimes it is the person beside whom loneliness becomes easier to bear.

The film features Papiya Adhikari, Biswajit Chowdhury, Moubani Sorcar, Kanyakumari, Mousumi Bhattacharya, Bodhisattva Mazumdar, Santana Bose, Dipanjan Bhattacharya Jack, Sharmistha Mukherjee, Aviraj, Deb Mondal and others.

The screenplay is written by Sajal Ghosh, cinematography is by Tirtha Mitra and editing is by Dipak Mondal. Chandan Roy Chowdhury has handled the music and background score, while Sujoy Kumar Mishra is responsible for colour grading. Sujoy Bhowmik and Dr Utsav Das provide playback vocals. The film is presented by Srija Films and produced by Chandan Dey.

Somnath Sen serves as both writer and director.

Earlier coverage of the project described it as a story emerging from the changing nature of contemporary families, where the outward appearance of a happy household can conceal emotional distance and conflict.

That makes the film particularly relevant to an increasingly urban society where generations often live under the same roof but struggle to find time for one another.

At its heart, ‘Pakhir Basa’ is about second chances.

Manomoy and Paroma have both lost important parts of their lives. But their meeting suggests that losing one chapter does not necessarily mean the entire story has ended.

The central question remains simple yet powerful: Can they leave behind the old nest and build a new home together?

The answer may ultimately belong to the audience.